১৩৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী মাদপুর মনসা মন্দিরের ইতিকথা! লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম।

0

তারক হরি, পশ্চিম মেদিনীপুর :
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার খড়গপুর লোকাল থানার অন্তর্গত মাদপুররের ঐতিহ্যবাহী মনসা মন্দির। মানুষের বিশ্বাস এখানে কেউ ভক্তিভরে মাকে মানত করলে,তা পূরণ করে দেন মা স্বয়ং।প্রতি বছর চৈত্র মাসের এই বিশেষ দিনে মায়ের বড় পুজো ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলাতে ঘিরে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় মন্দির এলাকায়। এমনকি রাজ্য ছাড়িয়ে পড়শী রাজ্য ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা আরো অন্যান্য রাজ্য থেকেও এই বিশেষ দিনে বহু মানুষ মাকে পুজো দিতে আসেন।
হাওড়া থেকে আপ খড়গপুর আসার পথে মাদপুর ও জকপুর ষ্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় রেল লাইনের পাশেই চোখে পড়ে মন্দিরটি।
এই মন্দিরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, নিজে নিজেরাই মাকে ভক্তিভরে পুজো দিতে পারেন তবেই এই বিশেষ পুজোর দিন ব্রাহ্মণ দ্বারায় পুজো হয়ে থাকে মন্দির গর্ভগৃহে এদিন সকলের ঢোকার অনুমতি থাকে না।
চৈত্র মাসের বিশেষ পুজো উপলক্ষে মনসা মন্দির চত্বরে লক্ষ লক্ষ মানুষ এসে যে যার মত মানত করে মাকে ভক্তি ভরে পুজো দেন।এই বিশেষ পুজো কে কেন্দ্র করে এক দিনের মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মন্দির চত্বরে নানান বিকিকিনি দোকানও বসে, যেখানে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস থেকে জামা কাপড় সবই মেলে।
আগে এই বিশেষ পুজোর দিন সন্ধের পরেই পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে যেত, তবে কালের নিয়মের সাথে সাথে এখন সেই নিয়মেরও পরিবর্তন হয়েছে,এখন মন্দির চত্বরে দুদিন নানান সংস্কৃতি অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে।
লোকশ্রুতি অনুযায়ী মনসা দেবীর মাহাত্ম্য,
১৮৮৯ সালের কিছু বছর আগের ঘটনা। সেই সময় কাজ চলছিল দক্ষিন পূর্ব রেলওয়ের হাওড়া থেকে আপ খড়গপুর রেললাইনের। খড়গপুর ষ্টেশন ঢোকার আগেই জকপুর আর মাদপুর ষ্টেশানের মাঝে। এই পুরো জায়গা টা জুড়ে ছিলো জঙ্গল আর লম্বা ঘাস। গাছ আর ঘাসের জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে শুরু হয় রেল লাইন পাতার কাজ।ঘাসের জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় প্রথম বার আবির্ভাব হয় মা মনসার স্তূপ। যেহুতু রেল লাইন এর কাজ এটার ওপরেই হবে তাই এটা ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু ভেঙে ফেলার আগের রাতেই মা স্বপ্নে এটা না ভেঙে ফেলার আদেশ দেয় কাজে নিযুক্ত শ্রমিকদের। শ্রমিকরা এটা সাহেব রেল ইঞ্জিনিয়ারকে বললে প্রথমে উনি বিশেষ পাত্তা না দিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। আর এর পরেই শুরু হয় নানান অলৌকিক ঘটনা! অস্বাভাবিক ভাবে প্রত্যেকের রকমের শরীর অসুস্থ হতে থাকে।
এরপর কিছু দিন কাজ বন্ধ থাকার পর ফের নতুন লোক নিয়ে কাজ করে রেল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তারপরও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ফলে বাধ্য হয়েই লাইন সোজাসুজি না করে,একটু দূর দিয়ে কার্ভ করে পাতা হয় রেলের পাত। ফলে সস্থানে বিরাজ করতে থাকে মা মনসার স্তূপ টি।
এরপর বেশ কয়েক দশক পর এখানে একটি জমিদার বাড়ি গড়ে ওঠে। জমিদারের অনেক গরু ছিল। তা দেখা শোনার জন্য লোকও রাখেন জমিদার। একসময় হটাৎ জমিদার লক্ষ্য করেন তার গরুগুলির দুধের পরিমাণ হটাৎ করে কমে গেছে। তাই তিনি দেখাশোনার লোকটিকে কি ব্যাপার হচ্ছে সেটা অনুসন্ধান করতে বলেন। জমিদারের নির্দেশমতো, লোকটি খুঁজে বার করেন যে, জঙ্গলের একটি বিশেষ জায়গায় জমিদারের গরু গুলি যায় এবং সেখানে একাধিক সাপ গরুর দুধের বোঁটা থেকে দুধ চুষে খাচ্ছে।

পাশাপাশি জানতে পারেন ওই স্থানে স্তূপের মত কিছু একটা বিরাজ করছে। এরপর জমিদার নিজে এসে ব্যাপার টা চাক্ষুস করে যান। তারপরের রাতেই জমিদার স্বপ্নদেশ পান যে, উনি মা মনসা দেবী, তাকে যেনো পূজিত করা হয়। স্বপ্নাদেশ পেয়ে জমিদার এখানের যাওয়া আসার রাস্তা তৈরি করেন, জঙ্গল পরিষ্কার করেন। সেই স্থানে একটি বেদী বানিয়ে মায়ের পুজো শুরু করেন। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে মন্দির তৈরি করতে গিয়ে। চারিদিক ঘেরার পর যখন ওপরের অংশ ঘেরা শুরু হয়, বিনা মেঘে হটাৎ বজ্রপাত হয়ে মৃত্যু হয় কর্মরত মিস্ত্রিদের। এরপরেও যতবার মন্দিরের ওপর আচ্ছাদন বা ছাদ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় অলৌকিকভাবে নানান ঘটনা ঘটতে থাকে।
বর্তমান সময়ে মন্দিরের চারিপাশ নানান কারুকার্য খচিত করে মন্দিরটি ঘেরা হলেও, উপরের অংশ এখনও সম্পূর্ণভাবেই ফাঁকা রাখা হয়েছে। অতীতের অলৌকিক ঘটনা মানুষের মুখে মুখে আজ মনসা দেবীর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়েছে। এই বিশেষ পুজোর দিনে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম রাজ্যের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম মেলা হিসেবে বৈশিষ্ট্য পেয়েছে। আরো জানা যায় এই বিশেষ পুজোর দিন ছাড়াও সারা বছরই মঙ্গল ও শনিবার মন্দিরে দূরদূরান্ত থেকে পুজো দিতে মানুষের সমাগম ভরে ওঠে। অলৌকিক ঘটনা আর মানুষের বিশ্বাসের মেলবন্ধনে আজ পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মাদপুর মনসা মন্দির এক ঐতিহ্যবাহী পিঠস্থান হিসেবে জেলার মানচিত্রে স্থান পেয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *