নিজস্ব সংবাদদাতা, নয়াদিল্লি: এক লহমায় বদলে গেল চেনা ছবিটা। বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজার ঠিক মুখে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন ও এসআইআর (SIR) মামলা নিয়ে মঙ্গলবার রণক্ষেত্রের চেহারা নিল সুপ্রিম কোর্টের এজলাস। প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানিতে ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়া এবং নতুন নাম নথিভুক্তকরণ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে একের পর এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন তুললেন রাজ্যের আইনজীবীরা। পালটা যুক্তিতে সরব হলো কমিশনও। সব মিলিয়ে, হবু বিধায়কদের ভাগ্য নির্ধারণের আগেই ভোটারদের নাম থাকা না-থাকা নিয়ে আইনি লড়াইয়ে তপ্ত হয়ে উঠল শীর্ষ আদালত।
মঙ্গলবার শুনানির শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে বর্ষীয়ান আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান সওয়াল করেন, সোমবার তড়িঘড়ি প্রায় ২৬ লক্ষ নামের একটি নিষ্পত্তির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ, আগামী ৬ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটের মনোনয়নের শেষ দিন। হাতে সময় যৎসামান্য। উদবেগের সুরে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “এত অল্প সময়ে এই বিশাল তালিকা যাচাই করে কাজ শেষ করা কার্যত অসম্ভব।” দিওয়ানের এই সওয়াল রাজ্যের শাসকদলের আশঙ্কাকেই মান্যতা দিল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে প্রধান বিচারপতি পরামর্শ দেন, রাজনৈতিক দলের নেতারা যেন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সাথে যোগাযোগ করে প্রার্থীদের তথ্য দ্রুত নিষ্পত্তির আবেদন জানান। যাতে আইনি জট দ্রুত খোলে এবং নির্বাচনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত না হয়।
কিন্তু রাজ্যের অপর আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় যান্ত্রিক ত্রুটির অভিযোগ তুলে কমিশনকে সরাসরি নিশানা করেন। তিনি জানান, অতিরিক্ত তালিকাগুলো ঠিকমতো ডাউনলোডই করা যাচ্ছে না। তাঁর বিস্ফোরক দাবি, “গত দু’বছরের কাজ কমিশন মাত্র দু’-তিন মাসে শেষ করার চেষ্টা করছে বলেই এই বিপত্তি।” কল্যাণবাবু তথ্য দিয়ে বোঝাতে চান, অন্য রাজ্যে নাম বাদ পড়ার সংখ্যা বেশি হলেও পশ্চিমবঙ্গের সমস্যাটি আসলে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতি, যা কমিশনের গাফিলতিকেই আড়াল করছে।
কমিশন অবশ্য হাল ছাড়তে নারাজ। তারা জানায়, তারা প্রতিদিন অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করতে প্রস্তুত এবং আগেই তারা এই প্রস্তাব কলকাতা হাইকোর্টকে দিয়েছে। কমিশনের আইনজীবী দাবি করেন, তারা আদালতের নির্দেশ মেনে কাজ করতে দায়বদ্ধ।
এদিন শুনানি চলাকালীন তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী। ভোটারদের অধিকার সুনিশ্চিত করতে বিচারকরা যে রাতদিন কাজ করছেন, তা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি একটি বিশেষ চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে আমরা নিশ্চিত করব যেন সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভোটারদের সুরক্ষা বজায় থাকে। প্রয়োজনে ওয়েস্ট বেঙ্গল জুডিশিয়াল সার্ভিস-এর সাহায্য নেওয়া হবে।” বিচারপতি বাগচী এই মন্তব্য রাজ্যের আইনি মহলে শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
তিনি এই মুহূর্তে একে অপরকে দোষারোপ না করে কমিশনকে হাইকোর্টের কাজে সাহায্য করার নির্দেশ দেন। রাজনৈতিক লড়াইয়ের দায় যেন বিচারব্যবস্থার ওপর না চাপে, সেই বার্তাই দিলেন বিচারপতি। আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী আদালতে আবেদন জানান যেন ভোটার তালিকায় নাম তোলার শেষ তারিখ বা ‘ফ্রিজ ডেট’ কিছুটা বাড়ানো হয়। বর্তমানে নিয়ম অনুযায়ী মনোনয়নের শেষ দিন পর্যন্ত নাম তোলা যায়। গুরুস্বামীর এই আর্জি আমজনতার ভোটাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
শীর্ষ আদালত এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছে। মনোনয়নের সময়সীমা বা ভোটার তালিকায় নাম তোলার তারিখ নিয়ে আদালত কোনো চূড়ান্ত ছাড় দেয় কি না, তা পরিষ্কার হবে আগামী ১ এপ্রিল, পরবর্তী শুনানির দিন। নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।