অর্পিতা কর্মকার, বর্ধমান: ঐতিহাসিক বর্ধমান উত্তরের বাতাসে এখন পুরোদস্তুর রাজনীতির লড়াই। মঙ্গলবার সকালে সরাইটিকর মোড় থেকে কাইজার গলির চায়ের আড্ডায় একটাই প্রশ্ন— টানা দু’বারের বিধায়ক নিশীথ মালিক কি পারবেন তাঁর হ্যাটট্রিক পূর্ণ করতে? নাকি বিজেপির ‘তরুণ তুর্কি’ সঞ্জয় দাসের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে উল্টে যাবে গত দশ বছরের সাজানো সমীকরণ? আর এই দুই ফুলের যুযুধান লড়াইয়ের মাঝে কাস্তে-হাতুড়ি হাতে বড় ব্যবধানের ‘কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছেন বামপ্রার্থী মামণি মণ্ডল রায়।
পরিসংখ্যানের বিচারে তৃণমূলের পাল্লা কিছুটা ভারী হলেও স্বস্তিতে নেই শাসকশিবির। গত ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নিশীথবাবু যেখানে ১৭ হাজার ২৬৮ ভোটে জিতেছিলেন, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে সেই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ২৯৭-এ। অর্থাৎ, গাণিতিক হিসেবে ঘাসফুল শিবির বেশ নিরাপদ আশ্রয়েই রয়েছে। কিন্তু রাজনীতির ময়দান শুধু সংখ্যায় চলে না। দীর্ঘ দশ বছরের বিধায়ক হওয়ার সুবাদে নিশীথবাবুর বিরুদ্ধে যে ‘প্রতিষ্ঠান বিরোধী’ হাওয়া তৈরি হয়েছে, তাকেই মূল হাতিয়ার করতে চাইছে গেরুয়া শিবির।
বিজেপি এবার বাজি ধরেছে সঞ্জয় দাসের ওপর। এলাকার তরুণদের মধ্যে সঞ্জয়ের গ্রহণযোগ্যতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর সোচ্চার লড়াই পদ্ম-শিবিরকে অক্সিজেন দিচ্ছে। সঞ্জয়ের রণকৌশল খুব পরিষ্কার— নিশীথের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি আর শাসকদলের দুর্নীতিকে এক করে সাধারণ মানুষের দরবারে পৌঁছে যাওয়া। যদি বিজেপি তাদের ২০১৯ বা ২০২১-এর সংগৃহীত ৯০ হাজার ভোটের ভিত বজায় রেখে অতিরিক্ত কিছু নতুন ভোট নিজেদের ঝুলিতে টানতে পারে, তবে নিশীথ মালিকের হ্যাটট্রিক করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই গোটা লড়াইয়ে সবথেকে বড় চমক হতে পারেন বামপ্রার্থী মামণি মণ্ডল রায়। গত বিধানসভায় বামেরা যেখানে প্রায় ৩১ হাজার ভোট পেয়েছিল, লোকসভায় তা কমে দাঁড়িয়েছিল ২১ হাজারে। রাজনৈতিক মহলের মতে, যদি মামণিদেবী এবার বামেদের হারানো ১০-১৫ হাজার ভোট নিজেদের ঘরে ফিরিয়ে আনতে পারেন, তবে তার সরাসরি কোপ পড়বে তৃণমূলের লিডের ওপর। অর্থাৎ, বামেদের ভোট যত বাড়বে, তৃণমূলের জয়ের মার্জিন ততই কমবে। আর ঠিক এই ‘বামেদের কাটা’তেই শেষ পর্যন্ত বাজিমাত করে দিতে পারেন বিজেপির সঞ্জয়।
আপাতত ভোটের ময়দান প্রস্তুত। একদিকে নিশীথের উন্নয়ন ও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বর্ম, অন্যদিকে সঞ্জয়ের পরিবর্তনের জোয়ার। আর দুইয়ের মাঝখানে নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা মামণি। শেষ পর্যন্ত বর্ধমান উত্তরের তখত কার দখলে থাকে, তা জানতে আপাতত চাতকের মতো অপেক্ষায় বর্ধমানের বাসিন্দারা।