ধর্মঘট শ্রমিকদের অধিকারকে লঘু করে

এস পি তিওয়ারি

চারটি শ্রমবিধি রূপায়ণ ভারতের বিপুল কর্মশক্তির জীবনধারার স্বাচ্ছন্দ্য বিধান ও উন্নয়নের লক্ষ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষত, অসংগঠিত ও অপ্রচলিত শ্রমক্ষেত্রের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত। এইসব সংস্কারের মধ্য দিয়ে জটিল শিল্পগত শ্রেণীবিন্যাসের বাধা সরিয়ে সমস্ত শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য পরিচিতি কার্ড বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়াও, এইসব শ্রমবিধিতে সামাজিক সুরক্ষার তাঁরা যাতে প্রত্যক্ষ সুযোগ পান, তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেইসঙ্গে, নিয়মিত এবং বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শ্রমিকদের স্বাচ্ছন্দ্য বিধানের পাশাপাশি তাঁদের আরও স্বাস্থ্যকর এবং উৎপাদনমুখী কর্মশক্তিতে পরিণত করবে। তাঁরা তাঁদের জীবনে যে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন বা মানসিক দুশ্চিন্তায় ভোগেন, তা দূর করতে সময় বেঁধে তাঁদের অভিযোগ নিষ্পত্তিরও নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। এক কথায় বলা যায়, মর্যাদাপূর্ণ, সুরক্ষিত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারতীয় শ্রম গোষ্ঠীর বিকাশে এইসব ব্যবস্থা একটি প্রগতিশীল পরিকাঠামো গড়ে তুলবে।

যদিও এই সমস্ত শ্রমবিধিতে সদর্থক সংস্থান রয়েছে, শ্রমিকদের কুফলের কথা না ভেবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এক শ্রেণীর কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন নিয়মিত ধর্মঘটের ডাক দিচ্ছে। এইসব ধর্মঘটের ফলে শ্রমিকদের মজুরি হারাতে হয়, বিশেষত দেশের অপ্রচলিত অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত প্রায় ৩৮ কোটি শ্রমিক, যাঁদের রুজি-রোজগার দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের সমস্যার কোনো নিরসন না ঘটিয়ে ঘন ঘন ধর্মঘটের ডাক যৌথ দাবিদাওয়ার প্রক্রিয়াকে শিথিল করে। এতে শ্রমিক ও কর্মচারীরা সদর্থক ও সমতাপূর্ণ ফল লাভেও ব্যর্থ হন।

সময়ের সঙ্গে পরীক্ষিত, ঘন ঘন এই জাতীয় ধর্মঘট একদিকে যেমন অনুৎপাদনমুখী, তার পাশাপাশি অকার্যকরও। এর ফলে শ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি সঞ্চিত হয়। ফলত, বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে শ্রমিকরা এই জাতীয় ধর্মঘটের ডাককে উপেক্ষা করছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইচ্ছার বিরুদ্ধে শ্রমিকদেরকে ধর্মঘটে বাধ্য করা হয়। এই জোর-জবরদস্তির ফলে নীতিগত বৈধতার ভিত্তি যেরকম ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ে, তার পাশাপাশি এই জাতীয় আন্দোলনের যৌথ শক্তিকেও তা বিপন্ন করে। ফলত, এই প্রবণতা শ্রমিক কল্যাণ ব্যবস্থার সার্বিক প্রভাব এবং শ্রমিকদের মধ্যে ঐক্যবোধকে ক্ষুণ্ণ করে।

ধর্মঘটের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট কেবল কর্মক্ষেত্রেই আবদ্ধ নয়, এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়, প্রাত্যহিক যাত্রীরা অসুবিধার মধ্যে পড়েন, রাস্তার হকারদের জীবনধারণ বিঘ্নিত হয়, গৃহস্থ কর্মীদের এবং ক্ষুদ্র পরিষেবা প্রদানকারীদের স্বার্থ বিপর্যস্ত হয়। এই সমস্ত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে একদিনের উপার্জন হারানো জীবনধারার সঙ্কট বাড়ায়। এতে তাঁদের সীমিত সঞ্চয় হারাতে হয়। ফলে আরও আর্থিক অনিশ্চয়তার গভীরে তাঁদেরকে তলিয়ে যেতে হয়।

ভারতের মতো বিকাশশীল অর্থনীতিতে শ্রমিক সংগঠনগুলির আলোচনা, মধ্যস্থতা এবং কর্মচারী ও সরকারের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। মডেল-ভিত্তিক সুস্থায়ী দরাদরি এবং সমন্বয়মূলক শ্রম বিধান উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সার্বিক আর্থিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত না করেও কর্মীদের সমস্যার নিরসন করতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতীয় কেন্দ্রীয় শ্রম সংগঠনগুলি, যারা ক্রমাগত তাদের নিজেদের প্রভাব হারাচ্ছে, তাদের মধ্যে অন্তর্দৃষ্টির প্রয়োজন রয়েছে যাতে আগামীদিনের তাদের ভূমিকা আরও বেশি কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।

ভারতীয় শ্রমিকদের সর্বাত্মক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে আরও বেশি সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সেক্ষেত্রে তাঁদের জীবনধারার স্বাচ্ছন্দ্য বিকাশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং সদর্থকভাবে নিজেদেরকে যুক্ত করা উচিত। বিবাদের নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বের থেকে শ্রেয় আলোচনা, যাতে কাজের প্রক্রিয়াও বিঘ্নিত হবে না, জাতীয় উন্নয়নও সুচারুভাবে সংগঠিত হবে। এই সমতাপূর্ণ এবং বাস্তবমুখী কৌশল শ্রমিকদের অধিকারকে প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী করবে এবং তাঁদের দীর্ঘস্থায়ী চলার পথকে সুরক্ষিত করবে।

লেখক : ট্রেড ইউনিয়ন কো-অর্ডিনেশন সেন্টার (টিইউসিসি)-র জাতীয় সাধারণ সম্পাদক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *