প্রয়াত বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া
সঙ্কেত ডেস্ক: বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৮০ বছর।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি গুরুতর শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। লিভারের মারাত্মক রোগ সিরোসিসের পাশাপাশি তাঁর আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা ছিল। এসব কারণে তিনি দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন ছিলেন।
স্বাস্থ্যগত সমস্যার পাশাপাশি খালেদা জিয়াকে দীর্ঘদিন আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ২০০৮ সালের একটি দুর্নীতি মামলায় অনাথদের জন্য বরাদ্দ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৮ সালে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি বিবেচনায় ২০২০ সালে তৎকালীন সরকার শর্তসাপেক্ষে তাঁর সাজা স্থগিত করে গৃহবন্দি অবস্থায় মুক্তি দেয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ওই মামলায় তাঁকে খালাস দেয় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দুই দফায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান শহীদ জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ১৯৮৪ সালে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক শাসনের অবসানে ভূমিকা রাখেন তিনি। পরবর্তীকালে তাঁদের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ‘ব্যাটল অব দ্য বেগমস’ নামে পরিচিতি পায়।
১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে রূপান্তর ঘটান। তাঁর শাসনামলে ভ্যাট চালু, গ্রামীণ মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে মাধ্যমিক শিক্ষা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।
তবে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের শাসনামলে তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে কথিত ‘হাওয়া ভবন’ থেকে সরকার পরিচালনার অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এই সময়ে জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে জোট সরকার গঠনের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে।
২০১৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না হওয়ায় ভোট বর্জনের সিদ্ধান্তকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় ভুল হিসেবে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। দীর্ঘ সময় শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের জেরে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়া প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহারের আহ্বান জানিয়েছিলেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে, ২৫ ডিসেম্বর, তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরেন।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে মতভেদ থাকলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া একজন শক্তিশালী ও প্রভাবশালী নেত্রী হিসেবেই স্মরণীয় থাকবেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোক নেমে এসেছে।
