ভারতের খাদ্য সুরক্ষায় সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা কেন জরুরী

0
barley

ডঃ কাঞ্চেতি ম্রুনালিনী

দশকের পর দশক ধরে ভারতীয় কৃষির কথা বলতে গেলে নিবিড় উৎপাদনশীলতার কথা আসে। কিন্ত এই অগ্রগতিতে মৃত্তিকার মতো মূল্যবান সম্পদের স্বাস্থ্যকে সঙ্কটাপন্ন করে তুলেছে। আজ যখন আমরা জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর মতো দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, “আরও বেশি প্রয়োজন” এই লক্ষ্যে রাসায়নিক সারের ব্যবহারে কিন্তু আমাদের কঠোর মূল্য দিতে হচ্ছে। আমাদের দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য নিরাপত্তাকে স্থির করতে ভারতের দরকার সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা (আইএনএম)। এই সর্বাত্মক কৌশল আমাদের মৃত্তিকার উজ্জীবিত শক্তির সংরক্ষণে আধুনিক বিজ্ঞান এবং প্রথাগত জ্ঞানের এক সমন্বয় ঘটায়।
আমাদের পায়ের তলায় সঙ্কট
ভারতীয় কৃষির মূলগত বৈশিষ্ট্যই হল ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জমি। যা সম্পূর্ণতই নাইট্রোজেনযুক্ত রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীল। বছরের পর বছর ধরে জমিতে একই ফসলের চাষ এবং ভারসাম্যহীন ব্যবহার মৃত্তিকার মানের ওপরে ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলেছে। এখন আমরা মৃত্তিকার বহুমুখী স্বাস্থ্যগত সঙ্কটকে প্রত্যক্ষ করছি। যেখানে চাষের মাটি পুরোপুরি সালফার, জিঙ্ক এবং বোরনের মতো ক্ষুদ্র স্বাস্থ্য উপাদানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

মাটির স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্থ হলে উৎপাদনগত দিককেও তা প্রভাবিত করে। যার অর্থ দাঁড়ায় কৃষকরা জমিতে সমপরিমাণ ফসল পেতে বেশি করে সারের ব্যবহার করলেও বস্তুত জমিতে উৎপাদন হ্রাস পায়। এই চক্রবৎ ব্যবস্থায় উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং খামখেয়ালী বৃষ্টি এবং অনাবৃষ্টির ওপর ফসলের উৎপাদন পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যা এখন ভারতের জলবায়ু পরিস্থিতিতে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনায়
আইএনএম-এ আধুনিক সারকে পরিগ্রহ করার কথা নয়, বরং বিচক্ষণতার সঙ্গে জৈব এবং প্রাকৃতিক উৎসের সমন্বয় ঘটানোর কথা বলছে। মৃত্তিকার স্বাস্থ্যকে ভারসাম্যযুক্ত পুষ্টির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে :
•রাসায়নিক সার : মাটিতে প্রয়োজনভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ব্যবহার।
•জৈব সার : খামারের সার (এফওয়াইএম), মিশ্র সার, ভার্মি সার এবং সবুজ সারের ব্যবহার।

•প্রাকৃতিক সার : উপকারী জীবানু যেমন রাইজোবিয়াম, অ্যাজোটোব্যাক্টর, মাইক্রোরাইজের ব্যবহারে স্বাভাবিকভাবেই মাটিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাসের দ্রাব্যকে যুক্ত করে।

•ফসলের অবশিষ্টাংশ : যা কিছু উৎপাদিত হল তাকে আবার মাটিতে ফিরিয়ে দিয়ে চক্রবৎ পুনর্ব্যবহার যোগ্য করে তোলা।
মাটির স্বাস্থ্যের ভিত্তিসমূহ আইএনএম কিভাবে কাজ করে তা বুঝতে মাটির স্বাস্থ্যের তিনটি ভিত্তির দিকে আমাদের তাকানো দরকার। এগুলি হল প্রাকৃতিক, রাসায়নিক এবং জৈবিক।

১. প্রাকৃতিক : আইএনএম মাটির কাঠামো এবং জলধারণ ক্ষমতার উন্নতি সাধন ঘটায়। বৃষ্টি নির্ভর এলাকার কৃষকদের জন্য এর অর্থ হল মাটি, স্পঞ্জের মতো কাজ করে। যা শুষ্ককালীন সময়ে মাটির আর্দ্রতাকে দীর্ঘস্থায়ী ধরে রাখতে পারে।
২. রাসায়নিক : এটা পিএইচ স্কেলের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং ম্যাক্রো ও মাইক্রো উপাদানগুলিকে মাটিতে আটকে না রেখে বা ধুয়ে যাওযার হাত থেকে রক্ষা করে গাছের মূলে পৌঁছায়।
৩. জৈবিক : হয়ত বা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা তা হল আইএনএম জীবানুগত বৈচিত্র্যের প্রসার ঘটায় এবং মাটিতে কেঁচোর সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করে। এরা হল ক্ষুদ্র কারিগর। যা চক্রবৎ পুষ্টিগত উপাদান এবং সুস্থায়ী উৎপাদনবর্ধক হিসেবে চাল, আটা, আখ চাষের এলাকায় নিবিড় ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।

ভারতীয় কৃষকদের জন্য প্রকৃষ্ট ব্যবস্থাসমূহ
আইএনএমকে পরীক্ষাগার থেকে মাটিতে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাস্তবিক ক্ষেত্র নির্ভর কৌশলের প্রয়োজন। সয়েল হেলথ কার্ড প্রকল্পের মতো জাতীয় উদ্যোগগুলিতে যে নকশা প্রদান করা হয়েছে তাতে কেবল অনুমানভিত্তিতে নয়, বরং মাটির প্রকৃত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ভিত্তিতে সারের ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।
মূল ব্যবস্থাপক নির্ণায়ক দিকগুলি বলতে নাইট্রোজেনের ব্যবহারকে ফসলের জীবনচক্রের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রাখা এবং নিম কোটেড ইউরিয়ার মতো উপাদানগুলির ক্রম পর্যায়ে প্রয়োজনভিত্তিক ব্যবহার করা। লিফ কালারড চার্টের মতো সরল সাশ্রয়ী ব্যবস্থার ধানের উৎপাদনে কৃষকদের কি পরিমাণ ইউরিয়া ব্যবহার করা দরকার, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। যাতে বর্জ্য এবং পরিবেশগত ধাক্কা কাটানো যায়। শিম-কে এই ফসল ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করলে তাতে মাটির নাইট্রোজেন সমৃদ্ধি হয় এবং সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা উপকৃত হয়।

ক্ষেত্রভিত্তিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক লাভ
ফার্ম স্তরে আইএনএমের প্রাসঙ্গিকতা সবথেকে বেশি প্রত্যক্ষ করা যায়। ভারত জুড়ে মাটিতে দীর্ঘ মেয়াদি ফসল চাষের পরীক্ষায় দেখা গেছে, সার এবং জৈব উপদানের সমন্বিত ব্যবহারের উচ্চ উৎপাদন বৃদ্ধি হয়। যা একক রাসায়নিক সার ব্যবহারের থেকে বেশি।
গড় চাষীদের ক্ষেত্রে যেসব সুবিধা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে :
•কম খরচ : মূল্যবান রাসায়নিকের আংশিক পরিবর্ত হিসেবে ফার্ম ভিত্তিক জৈব উপাদানের ব্যবহারে বাড়তি কোনও উপাদান ব্যবহারের প্রয়োজন হ্রাস করে।
•স্থিতিস্থাপকতা : শেকড়ের বৃদ্ধি ভালো হওয়ায় চাষ অনেক বেশি জলবায়ু স্থিতিস্থাপক হয়ে ওঠে। অনাবৃষ্টিজনিত পরিস্থিতিকেও তা কাটিয়ে উঠতে পারে।
•গুণগত মান : জিঙ্ক, আয়রণের মতো পুষ্টি উপাদান যুক্ত হওয়ায় ফসলের উৎপাদন যেমন বাড়ে, তার গুণগতমানও বৃদ্ধি পায়।
সম্মুখের টেকসই পথ
ব্যক্তিগত খামারের বাইরেও আইএনএম পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতার ক্ষেত্রে ভারতের জাতীয় অগ্রাধিকারকে যুক্ত করেছে। দ্রবণীয় খনিজ এবং বাষ্পীকরণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যগত উপাদান হ্রাসকে প্রশমন করে এই ব্যবস্থা পরিবেশ দূষণ এবং গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমণকে হ্রাস করে।
ভারতীয় কৃষির ভবিষ্যতের দিকে তাকালে এটা পরিষ্কার যে আমরা আমাদের মৃত্তিকাকে অনন্তকাল ধরে খনন করে যেতে পারব না। সমন্বিত পুষ্টিগত উপাদান ব্যবস্থাপনাই কেবলমাত্র কৃষক বান্ধব পথকে গড়ে দিতে পারে। তাতে চাষবাসের ব্যবস্থাকে আগামী প্রজন্মের জন্যেও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। আমাদের মৃত্তিকাকে নোংরা হিসেবে না দেখে নয়, বরং ভারসাম্যমূলক, সুস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে দেশবাসীর খাদ্য প্রয়োজন মেটাতে মৃত্তিকাকে আমাদের এক জীবন্ত ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করতে হবে।

(লেখিকা উত্তরপ্রদেশের কানপুরের আইসিএআর – ইন্ডিয়ান ইন্সস্টিটিউট অফ পালসেস রিসার্চ- এর বিজ্ঞানী)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *