নিজস্ব সংবাদদাতা: মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের কালো মেঘ। পশ্চিম এশিয়ায় বারুদের গন্ধ যত তীব্র হচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে ততই ঘনীভূত হচ্ছে অনিশ্চয়তার কুয়াশা। সাধারণ নিয়ম বলে, যুদ্ধের আবহে লগ্নিকারীরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটেন সোনার দিকে। ফলে আকাশছোঁয়া হয় হলুদ ধাতুর দাম। কিন্তু সপ্তাহের শুরুতেই সোমবার ভারতীয় বাজারে দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি। যাকে বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘উল্টো পুরাণ’।
এক ধাক্কায় রেকর্ড পতন ঘটল সোনা ও রুপোর দামে। সোমবার সকাল ১০টা ২৬ মিনিট নাগাদ এমসিএক্স (MCX) বাজারে সোনার দাম প্রায় ৫ শতাংশ বা ৭,১৮৫ টাকা পড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১,৩৭,৩০৭ টাকায় (প্রতি ১০ গ্রাম)। পিছিয়ে নেই রুপোও। প্রায় ৬ শতাংশ বা ১৩,১৭২ টাকা কমে এক কেজি রুপোর দাম থিতু হয়েছে ২,১৩,৬০০ টাকায়। গত কয়েক মাসের লাগাতার মূল্যবৃদ্ধির পর একদিনে এই বিপুল পতনকে বড়সড় ‘কারেকশন’ বা দর সংশোধন হিসেবেই দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই নাটকীয় পতনের নেপথ্যে রয়েছে প্রধানত তিনটি কারণ:
প্রথমত যুদ্ধের শুরুতে অতি-সতর্ক বিনিয়োগকারীরা বিপুল পরিমাণ সোনা ও রুপো কিনে মজুত করেছিলেন। এখন দাম শিখরে থাকায় বড় লগ্নিকারীরা বাজার থেকে মুনাফা তুলে নিতে শুরু করেছেন। প্রযুক্তিগত ভাষায় একেই বলা হচ্ছে ‘প্রফিট বুকিং’।
দ্বিতীয়ত অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়ানোয় বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা প্রবল। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি সুদের হার বাড়াতে পারে। আর সুদের হার বাড়লে লগ্নিকারীরা সোনার চেয়ে বন্ড বা ফিক্সড ডিপোজিটের মতো নিশ্চিত আয়ের উৎসে বেশি আকৃষ্ট হন।
তৃতীয়ত এশীয় শেয়ার বাজারে বড়সড় ধস নামায় লগ্নিকারীরা তাঁদের লোকসান সামাল দিতে সোনা বিক্রি করে নগদ টাকা হাতে রাখার চেষ্টা করছেন। কেসিএম ট্রেড-এর মুখ্য বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের মতে, বর্তমানে সোনার ‘তরলতা’ বা লিকুইডিটিই তার প্রতিকূলে কাজ করছে।
সামনে বিয়ের মরসুম। তার আগে সোনার এই পড়তি দরে মধ্যবিত্ত বাঙালির মনে যেমন স্বস্তি মিলেছে, তেমনই তৈরি হয়েছে একরাশ কৌতূহল। তবে কি সোনার উজ্জ্বলতা কমছে? বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এখনই আতঙ্কিত হতে বারণ করছেন। তাঁদের মতে, সোনা তার ‘নিরাপদ আশ্রয়’-এর তকমা হারায়নি। বাজারের এই পতন স্রেফ সাময়িক ভারসাম্য রক্ষা।
তবে যুদ্ধের বাজারে অনিশ্চয়তা যে পিছু ছাড়ছে না, তা দিনের পরিষ্কার আলোর মতোই স্পষ্ট। আপাতত সাধারণ মানুষের নজর— এই পতন কতদূর গড়ায়, তার ওপর।