সংস্কার, গতিশীলতা এবং সিদ্ধান্ত : ২০২৫-এ ভারতের অর্থনীতি

অমিতাভ কান্ত: গত পাঁচ বছরে বিশ্বজুড়ে একের পর এক প্রতিকূল ঘটনার জেরে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, অনিশ্চিত ব্যবসা-বাণিজ্য, সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধিপত্য বিস্তারের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। তবে এই বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতের ম্যাক্রো-অর্থনীতির স্থিতাবস্থা বজায় রয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে।

শেষ ত্রৈমাসিকে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৮.২ শতাংশ, যা পূর্বাভাসের তুলনায় বেশি। একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আর্থিক ঘাটতিও সহনীয় সীমার মধ্যেই আছে। সরকারের গৃহীত বিভিন্ন নীতির ফলে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে অভ্যন্তরীণ চাহিদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কর সংস্কারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হাতে ব্যয়যোগ্য অর্থ বাড়ানো হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাজেটে বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে কর ছাড়ের ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি, ১৯৬১ সালের আয়কর আইনের বদলে ২০২৫ সালের সরলীকৃত আইন কার্যকর হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) সংস্কারের মাধ্যমে দ্বিস্তরীয় কাঠামো চালু করা হয়। এর ফলে প্রশাসনিক জটিলতা কমেছে এবং ভোক্তাদের আস্থা বেড়েছে। উৎসবের মরশুমে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মোট অর্থনীতির প্রায় ৫৫-৬০ শতাংশ অভ্যন্তরীণ চাহিদার উপর নির্ভরশীল। গ্রাহকের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ও বিনিয়োগেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

শ্রম আইন সংস্কারকেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২৯টি আইনের পরিবর্তে চারটি আধুনিক শ্রম বিধি কার্যকর হওয়ায় কর্মী সুরক্ষা ও শিল্পায়নের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। সরকার দাবি করেছে, এই সংস্কার দেশের প্রায় ৬৪ কোটি কর্মীশক্তির উন্নতিতে সহায়ক হবে।

এদিকে, সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যনিধি, পেনশন ও বিমা প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ছে, যা দেশের মূলধন বাজারকে শক্তিশালী করছে। বিমা ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়ায় প্রতিযোগিতা ও পরিষেবার মানোন্নয়ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জিএসটি ও নিবন্ধীকরণ প্রক্রিয়ার সরলীকরণের ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। ক্ষুদ্র সংস্থার নিবন্ধীকরণের সময়সীমা ৩০ দিনের বদলে তিনদিন করা হয়েছে। পাশাপাশি, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ও আইআরডিএআই সহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিধিনিষেধ কমিয়ে সংস্কারের পথে হেঁটেছে।

পরিবেশ ও নির্মাণ ক্ষেত্রেও বড় সংস্কার আনা হয়েছে। শিল্প সংস্থার জন্য একক পরিবেশগত ছাড়পত্র চালু করা হয়েছে এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পের জন্য ‘হোয়াইট ক্যাটাগরি’ তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে শিল্পায়নের পথ আরও সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সরকার জানিয়েছে, ‘জনবিশ্বাস’ সংস্কারের আওতায় ২০০-র বেশি ছোটখাটো অপরাধকে ফৌজদারি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। একাধিক পুরনো আইন বাতিল করা হয়েছে এবং রাজ্যগুলিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড়পত্র প্রক্রিয়া সহজ করছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সংস্কারের ধারা অব্যাহত রয়েছে। সংসদের বাদল অধিবেশনে সামুদ্রিক বাণিজ্য সংক্রান্ত পুরনো আইন সংশোধন করা হয়েছে। পাশাপাশি, ব্রিটেন, নিউ জিল্যান্ড ও ওমানের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি এবং ইউরোপিয়ান ফ্রি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে সমঝোতা কার্যকর হওয়ায় রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন বাজার খুলেছে।

অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগের (MSME) সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের দাবি, এর ফলে এই শিল্পগুলির উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। রপ্তানিতে উৎসাহ দিতে ২০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা প্রকল্পও চালু করা হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সেন্টারের প্রসারের ফলে জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। এই প্রেক্ষিতে পারমাণবিক শক্তি খাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে সংসদে ‘শান্তি বিল’ পাশ হয়েছে। এর মাধ্যমে অসামরিক পারমাণবিক প্রকল্পে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগের পথ খুলেছে।

সংস্কারের ক্ষেত্র গ্রাম ও শিক্ষা ব্যবস্থাতেও বিস্তৃত হয়েছে। গ্রামীণ কর্মসংস্থান আইনে ন্যূনতম কাজের গ্যারান্টি ১০০ দিনের বদলে ১২৫ দিন করা হয়েছে। পাশাপাশি, শিক্ষাক্ষেত্রে একাধিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিবর্তে একটি অভিন্ন উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতের অর্থনীতি প্রাণবন্ত রয়েছে বলে দাবি সরকারের। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ২০২৫ সালকে সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারি মহলের মতে, আস্থা, সরল নিয়ম ও পূর্বাভাসযোগ্য নীতির মাধ্যমে এই সংস্কার বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করবে।
@লেখক : প্রাক্তন শেরপা জি-২০ এবং নীতি আয়োগের মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *