সারান্ডা: মাওবাদী দমনের নতুন অধ্যায়,নিহত ১৫ মাওবাদীরা তালিকায় বাঁকুড়ার সুরেন্দ্রনাথ
নিজস্ব প্রতিনিধি: ঝাড়খণ্ডের সারান্ডা জঙ্গলে ১৫ জন মাওবাদীর মৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি সফল এনকাউন্টার নয়, বরং মাওবাদী দমন নীতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বর্তমান কৌশলের কার্যকারিতার স্পষ্ট ইঙ্গিত। ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে দেশকে মাওবাদী-মুক্ত করার যে লক্ষ্যমাত্রা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছেন, সারান্ডার অভিযান সেই রোডম্যাপেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
গত এক দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, মাওবাদী সমস্যার মূল শক্তি ছিল দুর্গম জঙ্গল, স্থানীয় সমর্থন এবং শীর্ষ নেতৃত্বের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ। সারান্ডা দীর্ঘদিন ধরেই সেই ‘রেড করিডর’-এর অন্যতম শক্ত ঘাঁটি। সেখানে কোবরা ও রাজ্য পুলিশের যৌথ বাহিনীর সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো এবং শীর্ষ স্তরের নেতাদের খতম করা স্পষ্ট করে দেয় যে নিরাপত্তা বাহিনীর কৌশলে এখন আর কেবল প্রতিরোধ নয়, বরং লক্ষ্যভিত্তিক আঘাতই মূল ভরকেন্দ্র।
নিহতদের মধ্যে বাঁকুড়ার বাসিন্দা সুরেন্দ্রনাথ সোরেন ওরফে সমীরের উপস্থিতি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশার সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে দীর্ঘদিন ধরে যুবকদের মাওবাদী সংগঠনে যুক্ত হওয়ার যে প্রবণতা ছিল, তার মানবিক দিকটিও এই ঘটনায় ধরা পড়ে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, শিক্ষাজীবনে ব্যর্থতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতাই বহু ক্ষেত্রে এই পথে ঠেলে দিয়েছে এক প্রজন্মকে। কিন্তু সেই বাস্তবতা আজ আর সংগঠনের জন্য ঢাল হয়ে উঠছে না।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সাম্প্রতিক সময়ে মাওবাদী নেতৃত্বের তরফে বিভিন্ন রাজ্য সরকারকে চিঠি দিয়ে অভিযান বন্ধ রাখার আবেদন এবং আত্মসমর্পণের সময় চাওয়ার চেষ্টা। এটি কার্যত তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতার স্বীকারোক্তি বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—আলোচনার দরজা খোলা থাকলেও অস্ত্র হাতে সময় কেনার কৌশল গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে শুধুমাত্র এনকাউন্টার দিয়ে মাওবাদী সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, এই বাস্তবতাও অস্বীকার করার উপায় নেই। নিরাপত্তা বাহিনীর সাফল্যের পাশাপাশি উন্নয়ন, প্রশাসনিক উপস্থিতি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করাই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ। জঙ্গলমহলের মানুষের বিশ্বাস অর্জন না করলে শূন্যস্থান পূরণে নতুন চরমপন্থা মাথা তুলতে পারে।
সারান্ডার অভিযান তাই একদিকে যেমন রাষ্ট্রের দৃঢ়তার বার্তা দেয়, অন্যদিকে ভবিষ্যতের দায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। মাওবাদী দমনের এই পর্ব যদি নিরাপত্তা ও উন্নয়নের সমান্তরাল পথে এগোয়, তবেই ২০২৬-এর লক্ষ্যমাত্রা কেবল ঘোষণায় নয়, বাস্তবেও পূরণ হতে পারে।
