পাণ্ডবেশ্বর ২০২৬: খনি অঞ্চলের ধুলোয় ‘সম্মান’ আর ‘বদলা’র মহাযুদ্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদন, পাণ্ডবেশ্বর: আসানসোল শিল্পাঞ্চলের রুক্ষ মাটি আর কয়লাখনির কালো ধুলো মাখা পাণ্ডবেশ্বর এখন বঙ্গ রাজনীতির তপ্ত ‘এপিসেন্টার’। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে এক হাই-ভোল্টেজ লড়াইয়ের রূপরেখা। এই লড়াই শুধু ইভিএমের বোতাম টেপার নয়; এ লড়াই একদিকে শাসকদলের ‘সম্মানরক্ষা’, অন্যদিকে পদ্ম শিবিরের ‘বদলা’ নেওয়ার জেদ। একদা বামেদের এই দুর্ভেদ্য দুর্গে এখন মুখোমুখি দুই প্রাক্তন সতীর্থ— ‘দাদা’ জিতেন্দ্র তিওয়ারি বনাম ‘ভাই’ নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।

২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে যখন পাণ্ডবেশ্বরের তৎকালীন বিধায়ক জিতেন্দ্র তিওয়ারি ঘাসফুল ছেড়ে পদ্ম শিবিরে নাম লিখিয়েছিলেন, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এই খনি অঞ্চলে তৃণমূলের সূর্য অস্তমিত। কিন্তু সেই কঠিন সময়ে দলের ব্যাটন হাতে তুলে নিয়েছিলেন নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। মাত্র ৩,৮০৩ ভোটের ব্যবধানে জিতে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ব্যক্তি বড় নয়, সংগঠনই শেষ কথা। ২০২৬-এ তৃণমূলের কাছে মূল চ্যালেঞ্জ হলো সেই জয়ের ব্যবধান বাড়ানো এবং প্রমাণ করা যে, ‘গদ্দার’ তকমা দিয়ে যেকোনো হেভিওয়েটকে রুখে দেওয়া সম্ভব। নরেন চক্রবর্তীর প্রধান অস্ত্র তাঁর ‘মানুষের পাশে থাকা’ ভাবমূর্তি এবং ব্লকের পুরনো কর্মীদের একসূত্রে বাঁধার ক্ষমতা।

অন্যদিকে, বিজেপির কাছে পাণ্ডবেশ্বর মানেই একরাশ দহন। যে কেন্দ্রে দলের প্রার্থী খোদ প্রাক্তন মেয়র ও দাপুটে নেতা জিতেন্দ্র তিওয়ারি, সেখানে হার মানা ছিল এক বড় ধাক্কা। ২০২৬-এ সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতে মরিয়া গেরুয়া শিবির। লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে এই কেন্দ্র থেকে বিজেপির লিড বজায় থাকা তাদের বাড়তি অক্সিজেন দিচ্ছে। জিতেন শিবিরের লক্ষ্য স্পষ্ট, হারানো জমি ফিরে পাওয়া। রাজনৈতিক মহলের মতে, গত নির্বাচনের না-পাওয়ার ‘প্রতিশোধ’ নিতেই এবার কোমর বেঁধে নামছে বিজেপি।

তবে পাণ্ডবেশ্বরের এই দ্বিমুখী লড়াইয়ের মাঝে ‘এক্স ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠতে পারেন বামপ্রার্থী সন্তোষ দেবরায়। ২০১১ পর্যন্ত এই কেন্দ্র ছিল সিপিএমের দখলে। গত কয়েক নির্বাচনে বাম ভোট বিজেপির ঝুলিতে গেলেও, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বামেদের ভোটের হার সামান্য বেড়েছে। সন্তোষবাবুর মতো স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতা যদি পুরনো বাম ভোট ফেরাতে পারেন, তবে তা কার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলবে— তৃণমূল না বিজেপি? সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।

রাজনৈতিক মহলের মতে খনি অঞ্চলের ধস, পুনর্বাসন এবং ইসিএল (ECL) কর্মীদের অমীমাংসিত সমস্যাগুলোই এবার পাণ্ডবেশ্বরের শেষ কথা বলবে। খনি শ্রমিকদের বড় অংশের হিন্দিভাষী ভোট যেদিকে ঝুঁকবে, জয়ের মালা সম্ভবত তাদের গলাতেই উঠবে। পাণ্ডবেশ্বরের অলিতে-গলিতে এখন একটাই গুঞ্জন— ‘দাদা’র বদলা নাকি ‘ভাই’-এর সম্মান? ২০২৬-এর ফল যাই হোক না কেন, পাণ্ডবেশ্বর যে বাংলার রাজনীতির স্নায়ুযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *