নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুর:ভরদুপুরে দুর্গাপুর মহকুমা আদালত চত্বরে যখন ধুন্ধুমার কাণ্ড চলছে, তখন স্মৃতি ফিরছিল বুধবারের থমথমে মাঝরাতের। চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে একই ঘটনার রেশ ধরে দু’বার চরম উত্তেজনা ছড়াল শিল্পশহরের রাজনৈতিক মহলে। একদিকে মাঝরাতে তৃণমূলের ব্লক সভাপতিকে ঘিরে ধরে বিজেপির বিক্ষোভ, আর অন্যদিকে পরদিন দুপুরে তাঁকে আদালতে তোলার সময় জুতো উঁচিয়ে ‘চোর চোর’ স্লোগান— দুইয়ে মিলে বিধানসভা নির্বাচনের আবহে দুর্গাপুরের রাজনৈতিক পারদ এক ধাক্কায় অনেকটাই চড়ে গেল। মাঝরাতের তানসেন: বৈঠক-তত্ত্ব ও পুলিশের ‘উদ্ধার’ তৃণমূল বনাম বিজেপির এই টানাপড়েনের সূত্রপাত বুধবার গভীর রাতে, দুর্গাপুরের ইস্পাত নগরীর তানসেন এলাকায়। বিজেপি কর্মীদের অভিযোগ, ওই এলাকায় একটি ‘গোপন বৈঠক’ সারতে এসেছিলেন স্থানীয় তৃণমূলের ব্লক সভাপতি রাজীব ঘোষ। খবর ছড়াতেই এলাকায় জড়ো হন পদ্ম-শিবিরের কর্মী-সমর্থকরা। রাজীববাবুকে ঘেরাও করে শুরু হয় তুমুল বিক্ষোভ। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে তানসেন এলাকা নিমেষের মধ্যে রণক্ষেত্রের রূপ নেয়। খবর পেয়ে তড়িঘড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছায় দুর্গাপুর থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী। পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাওয়ার আগেই পুলিশ রাজীব ঘোষকে বিক্ষোভকারীদের হাত থেকে ‘উদ্ধার’ করে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পুরনো ক্ষোভের বিস্ফোরণ রাজীব ঘোষকে ঘেরাও করার নেপথ্যে শুধুই কি রাতের বৈঠক? বিজেপি নেতৃত্ব তা মানতে নারাজ। তাঁদের দাবি, এই ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। গেরুয়া শিবিরের অভিযোগ, রাজীব ঘোষ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও প্রতিহিংসামূলক আচরণ চালাচ্ছিলেন। বিরোধী কর্মীদের হুমকি দেওয়া এবং এলাকায় ‘তোলাবাজি’র সিন্ডিকেট চালানোর মূল মাথা ছিলেন তিনি। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী হিংসায় যে বহু বিজেপি কর্মী ঘরছাড়া এবং আক্রান্ত হয়েছিলেন, তার নেপথ্যেও হাত ছিল এই ব্লক সভাপতির। এরই মধ্যে জল্পনা উস্কে দিয়ে স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের একাংশ দাবি করেছেন, হাওয়া বদলের ইঙ্গিত পেয়ে রাজীব ঘোষ নিজেই ইদানীং বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলেন। তবে জেলা নেতৃত্ব সেই জল্পনায় জল ঢেলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাঁকে দলে নেওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।আদালত চত্বরে জুতো-বিক্ষোভ, আসরে কেন্দ্রীয় বাহিনী রাতের উত্তেজনার রেশ কাটতে না কাটতেই বৃহস্পতিবার দুপুরে ফের নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায় দুর্গাপুর মহকুমা আদালত চত্বরে। আটক তৃণমূল নেতাকে যখন আদালতে হাজির করার জন্য আনা হয়, তখন আগে থেকেই সেখানে ওত পেতে ছিলেন বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। গাড়ি থেকে রাজীববাবুকে নামানোর মুহূর্তেই আদালত চত্বর কেঁপে ওঠে “চোর চোর” স্লোগানে। বিক্ষোভের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, অনেককে জুতো উঁচিয়েও ক্ষোভ প্রদর্শন করতে দেখা যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্য পুলিশের পাশাপাশি তড়িঘড়ি নামানো হয় কেন্দ্রীয় বাহিনী। আদালত চত্বরে রীতিমতো ব্যারিকেড তৈরি করে অভিযুক্ত নেতাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। এই বিষয়ে জেলা বিজেপির মুখপাত্র সুমন্ত মণ্ডল বলেন, সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজীব ঘোষ এতদিন নিজের প্রভাব ধরে রেখেছিলেন। তোলাবাজি আর রাজনৈতিক অত্যাচারের জবাব মানুষ দিতে শুরু করেছে। তৃণমূলের অবস্থান ও তদন্ত পাল্টা তৃণমূল শিবিরের দাবি, নির্বাচনের মুখে দলের ব্লক সভাপতিকে কালিমালিপ্ত করতেই চক্রান্ত করে এই ঘেরাও এবং নাটকীয় বিক্ষোভ সাজিয়েছে বিজেপি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, তানসেন এলাকার ঘটনা এবং বিজেপির তোলা অভিযোগ— দু’টিরই তদন্ত শুরু হয়েছে। আদালতের শুনানি এবং আইনি প্রক্রিয়ার পর এই ঘটনার গতিপ্রকৃতি কোন দিকে ঘোরে, এখন সেদিকেই নজর শিল্পশহরের রাজনৈতিক মহলের। Share Post Whatsapp Share Post navigation বেআইনি পার্কিং রুখতে কড়া পুলিশ, সিটি সেন্টারে যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকা বাইকে দেদার জরিমানা