নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে ঘাসফুল শিবিরের ‘অভেদ্য দুর্গ’ বলে পরিচিত সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে কি এবার ফাটল ধরতে চলেছে? প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের নবগঠিত দল ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ (এজেইউপি) এবং আসাদউদ্দিন ওয়েইসির ‘মিম’-এর (এআইএমআইএম) জোট ঘোষণা অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। বিশেষ করে মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলিতে এই দুই শক্তির হাত মেলানো কেবল নির্বাচনী কৌশল নয়, বরং এক দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তনের ইশারা বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
হুমায়ুনের ‘ভূমিপুত্র’ তাস ও ওরোয়ার্সির আবেগ
তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর মুর্শিদাবাদের দাপুটে নেতা হুমায়ুন কবীর যখন হায়দরাবাদের নেতার সঙ্গে জোট বাঁধলেন, তখন থেকেই অস্বস্তি বেড়েছে শাসক শিবিরে। মুর্শিদাবাদ ও মালদহ—এই দুই জেলাই রাজ্যের সংখ্যালঘু রাজনীতির নাভিদেশ। গত নির্বাচনে এখানে তৃণমূল একতরফা সাফল্য পেলেও এবার চিত্রটা ভিন্ন। হুমায়ুন কবীর কেবল স্থানীয় আবেগ নয়, বরং রাজ্যে প্রথম ‘মুসলিম মুখ্যমন্ত্রী বা উপ-মুখ্যমন্ত্রী’ করার দাবি তুলে গ্রামীণ ভোটারদের সুপ্ত বাসনাকে উস্কে দিতে চাইছেন। সঙ্গে যোগ হয়েছে বাবরি মসজিদের আদলে মসজিদ তৈরির প্রতিশ্রুতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘ধর্মীয় আবেগ’ ও ‘ভূমিপুত্র’ কার্ডের মিশেল তৃণমূলের সাজানো বাগানে আগাছা তৈরি করতে পারে।
উন্নয়ন বনাম বঞ্চনার বয়ান
মালদহ ও মুর্শিদাবাদের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের অভাব দীর্ঘদিনের। মিম-হুমায়ুন জোটের প্রচারের মূল অস্ত্রই হলো— ‘সেকুলার’ দলগুলি সংখ্যালঘুদের কেবল ভোটযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, প্রকৃত উন্নয়ন পৌঁছায়নি। এর সঙ্গে ওবিসি শংসাপত্র বাতিল সংক্রান্ত জটিলতা এবং এনআরসি-সিএএ আতঙ্ককে হাতিয়ার করে যুব সম্প্রদায়ের ক্ষোভকে পালে টানতে চাইছে এই জোট।
‘ভোট কাটকুটি’র অঙ্ক ও বিজেপির ছায়া
তৃণমূল অবশ্য এই জোটকে ‘বিজেপির বি-টিম’ বলে দেগে দিয়েছে। শাসক দলের দাবি, সংখ্যালঘু ভোট ভাগ করে আদতে গেরুয়া শিবিরকেই সুবিধা করে দিতে চাইছেন হুমায়ুনরা। কিন্তু মাটির লড়াইয়ে অঙ্কটা আরও জটিল। এবার লড়াই চতুর্মুখী— একদিকে তৃণমূল, অন্যদিকে বাম-আইএসএফ জোট, তৃতীয়ত এককভাবে লড়া কংগ্রেস এবং চতুর্থ শক্তি হিসেবে হুমায়ুন-মিম জোট। যদি এই নতুন জোট ১০-১৫ শতাংশ ভোটও নিজেদের দিকে টানতে পারে, তবে অনেক আসনেই তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান কমে আসবে, যার সরাসরি সুফল পেতে পারে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। যদিও বিজেপির পাল্টা অভিযোগ, এই নাটকের নেপথ্যে খোদ তৃণমূলেরই হাত রয়েছে।
প্রভাব কেবল উত্তরে নয়, দক্ষিণেও
মালদহ-মুর্শিদাবাদ এই জোটের কেন্দ্রবিন্দু হলেও উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতেও এর প্রভাব পড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা। ইসলামপুর বা গোয়ালপোখরের মতো সংখ্যালঘু প্রধান আসনগুলিতে মিম আগে থেকেই সংগঠন মজবুত করছিল। দক্ষিণবঙ্গের বীরভূম, উত্তর ২৪ পরগনা এমনকি ভবানীপুর বা নন্দীগ্রামের মতো হাই-প্রোফাইল আসনেও প্রার্থী দিয়ে শাসক দলকে স্নায়ুচাপের মধ্যে রাখার কৌশল নিয়েছেন হুমায়ুন।
পরিশেষে, ২০২৬-এর নির্বাচন কেবল একটি সরকার গঠনের লড়াই নয়, বরং সংখ্যালঘু ভোট কোন দিকে ঝুঁকে থাকে, তার ওপর নির্ভর করছে বাংলার আগামীর রাজনৈতিক ব্যাকরণ। ৪ মে-র ফলাফলই বলে দেবে, হুমায়ুনের এই ‘বিকল্প রাজনীতি’ নবান্নের মসনদ দখলে কার পথে কাঁটা বিছিয়ে দিল।