সঙ্কেত ডেস্ক: দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোয় আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল মোদী সরকার। লোকসভার আসন সংখ্যা একধাক্কায় প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৮১৫ করার পরিকল্পনা পেশ করলেন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল। শুধু আসন বৃদ্ধিই নয়, এর মধ্যে ২৭২টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত রাখার ঐতিহাসিক প্রস্তাবও দিয়েছে কেন্দ্র। বৃহস্পতিবার সংসদের বিশেষ অধিবেশনে এই সংক্রান্ত তিনটি সংশোধনী বিল পেশ ঘিরে শুরু হয়েছে প্রবল রাজনৈতিক তরজা।
সংবিধানের ১৩১ তম সংশোধনী বিলের পাশাপাশি
ডিলিমিটেশন বা সীমানা পুনর্নির্ধারণ কমিশন সংক্রান্ত বিলটিও এদিন পেশ করা হয়। সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপের ফলে সংসদে মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব যেমন বাড়বে, তেমনই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আরও সুসংহত হবে।
কী রয়েছে কেন্দ্রের প্রস্তাবে?
কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল লোকসভায় জানান, বর্তমান ৫৪৩টি আসন থেকে বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৮১৫-এ।
মোট আসনের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ২৭২টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হবে। ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতেই এই সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশনের কাজ এগোতে চায় সরকার।কেন্দ্রের এই প্রস্তাব নিয়ে সম্ভবত খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লোকসভায় বক্তব্য রাখতে পারেন। বিরোধীদের সমর্থন আদায়ে তিনি সওয়াল করবেন বলেই সূত্রের খবর।
‘আরএসএস-এর ঠিক করে দেওয়া অঙ্ক’, তোপ কংগ্রেসের
সরকারের এই ‘মেগা’ পরিকল্পনা ঘিরেই দানা বেঁধেছে বিতর্ক। কংগ্রেসের অভিযোগ, আসন বাড়ানোর আড়ালে আসলে নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক পোক্ত করতে চাইছে বিজেপি। অসমের কংগ্রেস সাংসদ গৌরব গগৈ কড়া ভাষায় আক্রমণ শানিয়ে বলেন, “সরকার কোন মানদণ্ডে ৫০ শতাংশ আসন বাড়াতে চাইছে? মহিলাদের সংরক্ষণের কথা বলে আসলে বিজেপির জয় নিশ্চিত করার কৌশল নেওয়া হচ্ছে। এই বর্ধিত আসন সংখ্যার অঙ্ক কষে দিয়েছে আরএসএস।”
কংগ্রেসের পাল্টা দাবি, লোকসভার বর্তমান আসন সংখ্যা অপরিবর্তিত রেখেই মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকর করা হোক। অন্যদিকে সংসদীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু পাল্টা দাবি করেন, সর্বদলীয় বৈঠকে সরকার সব ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিল, কিন্তু কংগ্রেস সেই বৈঠক বয়কট করে নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়েছে।
দক্ষিণ ভারতের আশঙ্কা ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো
আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি। তামিলনাড়ু বা কেরলের মতো রাজ্যগুলির আশঙ্কা, অতীতে যারা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, নতুন ডিলিমিটেশনে তাদের আসন সংখ্যা আনুপাতিক হারে কমে যেতে পারে। ফলে সংসদীয় রাজনীতিতে উত্তর ভারতের দাপট বাড়বে এবং দক্ষিণ ভারতের গুরুত্ব কমবে। এই ‘আঞ্চলিক বৈষম্য’ নিয়ে বিরোধীরা একজোট হয়ে সরব হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
এক নজরে নতুন বিলের মূল দিক:
তিনটি বিল:সংবিধান সংশোধনী, ডিলিমিটেশন এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সংক্রান্ত আইন সংশোধন।
বিশেষ অধিবেশন: বাজেট অধিবেশনের সম্প্রসারিত পর্বে এই বিলগুলি নিয়ে আলোচনা।
বাস্তবায়ন: ২০২৩ সালে বিল পাস হলেও জনগণনার মারপ্যাঁচে তা আটকে ছিল, এবার নয়া সংশোধনীতে তাকেই অগ্রাধিকার।
সব মিলিয়ে দিল্লির রাজনীতির অলিন্দে এখন একটাই প্রশ্ন— এই আসন বৃদ্ধির অঙ্ক কি শুধুই নারী সশক্তিকরণ, নাকি ২০২৯-এর লক্ষ্যে বিজেপির এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক চাল? বিরোধীদের আপত্তি কাটিয়ে সরকার এই বিল কীভাবে পাস করায়, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা দেশ।