নিজস্ব সংবাদদাতা, দুর্গাপুর:রাজনীতির আঙিনায় ভোলবদল নতুন নয়, কিন্তু শিল্পশহরের একদা ‘জনপ্রিয়’ মুখ বিশ্বনাথ পাড়িয়ালের সাম্প্রতিক ডিগবাজি সম্ভবত সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেল। তৃণমূল থেকে বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী হয়ে বিধানসভার টিকিট নিশ্চিত করা, সেখান থেকে পুনরায় শাসকদলে প্রত্যাবর্তন— আর এবার ভোটের হাওয়া মেপে রাতারাতি গেরুয়া শিবিরে নাম লেখানো। রাজনৈতিক মহলের কটাক্ষ, গিরগিটির মতো এই রং বদলের খেলায় বিশ্বনাথবাবু হয়তো ক্ষমতার বৃত্তে টিকে থাকতে চাইছেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের চোখে তিনি আজ কার্যত এক ‘রাজনৈতিক দেউলিয়া’।
শনিবার ঠিক সন্ধ্যা ৬টা। স্থান— আসানসোলের প্রাক্তন সাংসদ সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়ার বাসভবন। সেখানেই রচিত হলো এক অদ্ভুত নাটকের ক্লাইম্যাক্স। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে যাঁর বিরুদ্ধে লড়ে পরাজিত হয়েছিলেন, সেই বিজেপি নেতা লক্ষ্মণ ঘড়ুইয়ের হাত ধরেই পদ্মশিবিরে প্রবেশ করলেন বিশ্বনাথ। যে প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে কয়েক মাস আগেও খড়্গহস্ত ছিলেন, তাঁর সাথেই এখন গলায় গলায় পিরিতি দেখে তাজ্জব রাজনৈতিক কারবারিরা।
শিল্পশহরের অলিতে-গলিতে এখন একটাই আলোচনা— এ কি সত্যিই কোনো আদর্শগত পরিবর্তন, নাকি নিছকই ক্ষমতার সমীকরণে পাল্লা ভারী করার অঙ্ক? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বারবার দলবদলের ফলে বিশ্বনাথবাবু তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কর্মী ও সমর্থকদের হারিয়েছেন। নিচুতলার কর্মীদের কাছে বড় প্রশ্ন— ‘দাদা’র নির্দিষ্ট আদর্শটা ঠিক কী? মানুষের দেওয়া ভোটের রায়কে এভাবে বারবার ব্যক্তিগত স্বার্থে জলাঞ্জলি দেওয়া গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর বড়সড় আঘাত বলেই মনে করছেন শহরের বুদ্ধিজীবী মহল। যে নেতার এক সময় বিশাল জনভিত্তি ছিল, আজ তাঁকেই নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে একসময়ের ‘শত্রু’র শরণাপন্ন হতে হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলের এক প্রবীণ বাম সমর্থকের কথায়, “রাজনীতি এখন আর নীতি-আদর্শের বালাই নেই, এ যেন শুধুই মিউজিক্যাল চেয়ার।” বিজেপিতে যোগ দিয়ে তিনি কতটা গুরুত্ব পাবেন বা পদ্ম-শিবির তাঁকে আদৌ আপন করে নেবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে তৃণমূল ত্যাগের পর শাসকদলের জেলা নেতৃত্বও কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। তাঁদের মতে, “যাঁরা নীতিহীন, তাঁদের জন্য দলের দরজা চিরতরে বন্ধ।”সব মিলিয়ে, দুর্গাপুরের রাজনীতির ‘রংবদলু’ এই নায়ক কি শেষ পর্যন্ত নিজের রাজনৈতিক গাম্ভীর্য হারিয়ে স্রেফ এক সুযোগ সন্ধানী নেতায় পর্যবসিত হলেন? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দামোদরের পাড়ে।