<সরকারি গাড়ি কি আধিকারিকের পারিবারিক সম্পত্তি? বেড়ানো, শপিং মল থেকে মেলা—জনগণের টাকায় ব্যক্তিগত সুবিধার অভিযোগে উঠছে জবাবদিহির প্রশ্ন শুরু হচ্ছে জিপিএস (GPS) ও ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট - বললেন পরিবহন মন্ত্রী অর্জুন সিং। কলমে ঈশানী মল্লিক
সরকারি গাড়ি বরাদ্দ দাপ্তরিক কাজের জন্য, নাকি আধিকারিকের পরিবারের অবাধ যাতায়াতের জন্য? অফিসের পর, ছুটির দিনে কিংবা পুজোর মরসুমে সরকারি গাড়িতে ব্যক্তিগত ভ্রমণ, জ্বালানির খরচ এবং চালকদের ওপর চাপের অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন উঠছে সরকারি সম্পদের ব্যবহার ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে।
সরকারি গাড়ি কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি সরকারি কাজের সুবিধার্থে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ করা হয়। সেই গাড়িতে আধিকারিকের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শপিং মল, মেলা, পুজোর অনুষ্ঠান ঘরোয়া গেট টুগেদার, কিংবা অন্য কোনও ব্যক্তিগত গন্তব্যে যাতায়াত করা হলে তার খরচ কে বহন করছেন? জ্বালানি যদি সরকারি অর্থে কেনা হয়, চালকের বেতন যদি সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হয়, তাহলে ব্যক্তিগত সুবিধার মূল্যও কি শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হচ্ছে না?
এই প্রশ্ন কোনও ব্যক্তিবিশেষকে লক্ষ্য করে নয়। এটি সরকারি সম্পদের ব্যবহার, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যয় এবং সরকারি কর্মচারীদের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন।
সরকারি বিধিতে কী বলা আছে?
১. পরিবহণ দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি: ১৯ জুন ২০১৪
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবহণ দপ্তরের Notification No. 2516-WT/3M-98/2006, তারিখ ১৯ জুন ২০১৪-তে লাল বা নীল বাতিযুক্ত ভাড়ার গাড়ির ব্যবহার সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, এই ধরনের গাড়ি কেবল সরকারি কাজে ব্যবহার করা যাবে এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিককেই সেই গাড়ি ব্যবহার করতে হবে। অফিসের সময়ের পরে অ-দাপ্তরিক কাজে ওই গাড়ির ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
বিজ্ঞপ্তির ৫ নম্বর ধারায় সংশ্লিষ্ট নির্দেশ লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা বা prosecution-এর কথাও রয়েছে।
সরকারি বিজ্ঞপ্তি: https://www.wbja.nic.in/wbja_adm/files/Notification.pdf
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই নিষেধাজ্ঞাটি নির্দিষ্ট ধরনের লাল বা নীল বাতিযুক্ত ভাড়ার গাড়ির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একে সব সরকারি গাড়ির ক্ষেত্রে একই ভাষায় প্রযোজ্য বলে দাবি করা যাবে না। অন্য গাড়ির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের শর্ত এবং প্রযোজ্য সরকারি আদেশও পরীক্ষা করতে হবে।
২. Finance Department-এর মেমো: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের Finance Department-এর Audit Branch (Group T) থেকে জারি করা Memo No. 560-F(Y), dated 15.02.2022 সরকারি দপ্তরগুলিতে মাসিক বা সাময়িক ভিত্তিতে ভাড়া করা গাড়ির ব্যবহারের আর্থিক দিকটি স্পষ্ট করে।
এই মেমোতে বলা হয়েছে, শনিবার, রবিবার বা ঘোষিত ছুটির দিনে গাড়ি বাস্তবে ব্যবহার করা হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রধানকে সেই ব্যবহার প্রত্যয়িত করতে হবে। অন্যদিকে, গাড়ি ব্যবহার না করে শুধু সম্ভাব্য প্রয়োজনের জন্য stand-by হিসেবে রাখা হলে, নির্দিষ্ট শর্তে লগবুকে দেওয়া স্ট্যান্ড-বাই সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে দৈনিক ভাড়ার টাকা দেওয়া যেতে পারে। এই নির্দেশ ১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ থেকে কার্যকর হয়।
সরকারি মেমো: https://finance.wb.gov.in/writereaddata/560-F%28Y%29%202022.pdf
এই নির্দেশের তাৎপর্য হল, ছুটির দিনে গাড়ির ব্যবহার এবং গাড়ি স্ট্যান্ড-বাই রাখা—দুটি আলাদা বিষয়। সরকারি গাড়ির বিল, লগবুক এবং সংশ্লিষ্ট সার্টিফিকেশনের যথার্থতা তাই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই মেমোটি নিজে থেকে প্রত্যেক আধিকারিকের ব্যক্তিগত ভ্রমণ নিষিদ্ধ করে না। এটি মূলত মাসিক ভিত্তিতে ভাড়া করা গাড়ির বিল ও স্ট্যান্ড-বাই চার্জ সংক্রান্ত নির্দেশ।
৩. All India Services (Conduct) Rules, 1968: সরকারি সম্পদের ব্যবহার ও আধিকারিকের দায়িত্ব
IAS, IPS এবং অন্যান্য প্রযোজ্য All India Services-এর সদস্যদের ক্ষেত্রে সংশোধিত Conduct Rules-এর Rule 3(2B)-তে সরকারি সম্পদের দক্ষ, কার্যকর ও মিতব্যয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি পদ ব্যবহার করে নিজের, পরিবারের বা বন্ধুদের আর্থিক কিংবা বস্তুগত সুবিধা আদায় না করার নীতিও উল্লেখ রয়েছে।
ভারত সরকারের Press Information Bureau-র ৮ আগস্ট ২০১৪-এর বিজ্ঞপ্তিতে এই সংশোধনের বিষয়গুলি ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।
সরকারি সূত্র: https://www.pib.gov.in/newsite/PrintRelease.aspx?lang=2®=48&relid=108295
এই নীতিগুলি সরকারি সম্পদের অপব্যবহার এবং সরকারি পদ থেকে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের সার্ভিস, গাড়ির বরাদ্দের শর্ত এবং প্রমাণ বিচার করেই বিধিভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
চালক কি সরকারি গাড়ির সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচারকও?
বিতর্কের আরেকটি গুরুতর দিক হল চালকদের কর্মপরিবেশ। অভিযোগ, কোনও কোনও ক্ষেত্রে অফিসের কাজের বাইরে আধিকারিকের ব্যক্তিগত প্রয়োজনেও চালকদের গাড়ি চালাতে বলা হয়। কখনও ছুটির দিনে, কখনও অফিসের নির্ধারিত সময়ের পরে। চালক অতিরিক্ত কাজের জন্য টাকা চাইলে তাঁকে ধমক দেওয়া বা চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠতে পারে।
এই অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু গাড়ির অপব্যবহারের প্রশ্ন নয়; এটি কর্মক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কর্মীর প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নও।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের Finance Department-এর Memo No. 650-F(P1), dated 18.02.2021-এ সরকারি গাড়ির সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারী চালক, ক্লিনার, হেল্পার ও খালাসিদের বিশেষ ভাতা বা দৈনিক ভাতা সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। রবিবার ও ছুটির দিনে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্দিষ্ট শর্তে বিশেষ ভাতার ব্যবস্থাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিধানটির প্রকাশিত পাঠ: https://wbxpress.com/special-allowance-driver-cleaner-helper-khalasi/
অর্থাৎ, চালকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব ও ছুটির দিনের কাজের বিষয়টি সরকারি বিধির বাইরে নয়। তবে কোনও নির্দিষ্ট চালক কোন হারে বা কোন শর্তে ভাতা পাবেন, তা তাঁর নিয়োগের ধরন, প্রযোজ্য আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিয়ম দেখে স্থির করতে হবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ, কোনও আধিকারিক ব্যক্তিগত কাজে চালককে ব্যবহার করে থাকলে সেই যাত্রা সরকারি দায়িত্বের অংশ কি না, তা আগে নির্ধারণ করতে হবে। ব্যক্তিগত কাজকে সরকারি ডিউটি হিসেবে দেখিয়ে অতিরিক্ত ভাতা দাবি করা যেমন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে, তেমনই প্রকৃত সরকারি দায়িত্ব পালন করেও চালক প্রাপ্য ভাতা থেকে বঞ্চিত হলে তারও তদন্ত প্রয়োজন।
প্রশ্ন শুধু গাড়ির নয়, সরকারি অর্থেরও
একটি সরকারি গাড়ির সঙ্গে একাধিক খরচ যুক্ত থাকে—জ্বালানি, চালকের বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামতি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে গাড়ি ভাড়া। ফলে সরকারি গাড়িতে ব্যক্তিগত যাতায়াতের অভিযোগ উঠলে শুধু গাড়িটি কোথায় গিয়েছিল, তা জানলেই হবে না। সেই যাত্রার উদ্দেশ্য, লগবুকের এন্ট্রি, জ্বালানির বিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের হিসাবও পরীক্ষা করতে হবে।
পুজোর সময় কিংবা অন্য ছুটিতে কোনও আধিকারিক পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গাড়িতে ঘুরেছেন—এমন অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর চাওয়া জরুরি:
গাড়িটি কি সরকারি মালিকানাধীন, নাকি সরকারি অর্থে ভাড়া করা?
গাড়ির বরাদ্দপত্রে ব্যক্তিগত ব্যবহারের অনুমতি আছে কি?
সংশ্লিষ্ট যাত্রার জন্য কোনও অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি?
লগবুকে যাত্রার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও গন্তব্য কী লেখা হয়েছে?
সরকারি জ্বালানি ব্যবহার করা হলে তার হিসাব কী?
ব্যক্তিগত ব্যবহার অনুমোদিত হলে তার জন্য নির্ধারিত হারে অর্থ জমা দেওয়া হয়েছে কি?
চালককে ছুটির দিনে বা নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ করানো হলে সেই কাজের অনুমোদন ও প্রাপ্য ভাতার হিসাব রয়েছে কি?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর নথির ভিত্তিতে পাওয়া গেলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা অনেক সহজ হবে।
Finance Department ও Labour Department-এর ভূমিকা
সরকারি গাড়ির বরাদ্দ, জ্বালানি ব্যয়, ভাড়া, লগবুক এবং সরকারি অর্থের হিসাবের ক্ষেত্রে Finance Department ও Transport Department-এর প্রাসঙ্গিক আদেশ গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, চালকের নিয়োগের ধরন অনুযায়ী তাঁর কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক এবং চাকরির শর্ত পরীক্ষা করতে হবে।
তবে সরকারি আধিকারিকদের পরিবারের ব্যক্তিগত ভ্রমণে সরকারি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে Labour Department-এর কোনও নির্দিষ্ট, সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ এখানে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই সেই দপ্তরের নামে কোনও অপ্রমাণিত আদেশ উদ্ধৃত করা সমীচীন নয়।
প্রশাসনের কাছে জবাবদিহির দাবি
সরকারি গাড়ি কোনও ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের উপকরণ নয়। সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও তার অর্থ এই নয় যে সরকারি সম্পদকে ব্যক্তিগত সুবিধার অবাধ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। আবার কোনও আধিকারিকের পরিবার গাড়িতে উঠেছেন বলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিধিভঙ্গ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো যায় না। গাড়ির বরাদ্দের শর্ত, সংশ্লিষ্ট পদে প্রযোজ্য নিয়ম, অনুমোদন এবং ব্যয়ের হিসাব—সবই পরীক্ষা করতে হবে।
যদি প্রমাণিত হয় যে সরকারি কাজে বরাদ্দ গাড়ি ব্যক্তিগত বেড়ানো, শপিং মল, মেলা বা পারিবারিক ভ্রমণে ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেই খরচ অননুমোদিতভাবে সরকারি কোষাগার থেকে বহন করা হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। একইভাবে, চালকদের ভয় দেখিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে অতিরিক্ত কাজ করানোর অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা দরকার।
সরকারি কর্মচারীদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা শুধু নিয়ম মেনে অফিস করা নয়; জনগণের অর্থের প্রতিটি টাকার ব্যবহারেও স্বচ্ছতা বজায় রাখা। সরকারি গাড়ির চাকা যদি ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য ঘোরে, তবে তার জ্বালানির হিসাবও জনগণের সামনে স্পষ্ট হওয়া উচিত।
এই প্রসঙ্গে রাজ্যের পরিবহণ দফতরের মন্ত্রী অর্জুন সিং জানিয়েছন, “গাড়ি বা যে কোনো জিনিস সেটা ভালো কাজে ব্যবহার করার জন্য। কোনো কিছুর অপব্যবহার ঠিক না। অফিস যাতায়াত, অফিসিয়াল পারপাস আর দেখা গেল যে সেই নির্দিষ্ট রাস্তায় তার অন্য একটা কাজ সেই সময় রয়েছে। এই সামান্য বিষয়গুলোতে পারমিশন দেওয়া যায়। কিন্তু যে কোনো প্রয়োজনে আমার কাছে একটা গাড়ি আছে আমি উৎসব, অনুষ্ঠানে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করলাম, লোকের কাছে মান বাড়ালাম। এগুলো ঠিক না। আমাদের দপ্তরেও এই রকম অভিযোগ এসেছে। আমরা পরিকল্পনা করেছি, জিপিএস (GPS) ও ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট চালু করব।”
What do you feel about this post?
Like
Love
Happy
Haha
Sad