নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটা বৃহস্পতিবার। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল দশটা বেজে কিছু বেশি। কলকাতা হাইকোর্টের গেট দিয়ে যখন সাদা ধবধবে শাড়ির ওপর কালো কোট আর আইনজীবীর গাউন পরা সেই পরিচিত ব্যক্তিত্বটি প্রবেশ করলেন, মুহূর্তের জন্য থমকে গেল আদালত চত্বর। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় পর তিনি আর ‘মুখ্যমন্ত্রী’ নন, কিন্তু তাঁর উপস্থিতির ওজন যে একচুলও কমেনি, তা বুঝিয়ে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার রাজনীতিতে কার্যত ‘অশনি সংকেত’ হয়ে আসা ২০২৬-এর ফলপ্রকাশের পর, এই প্রথম এক সম্পূর্ণ ভিন্ন অবতারে ধরা দিলেন তৃণমূল নেত্রী।

এদিন প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের এজলাসে মামলা ছিল ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে। উত্তরপাড়ার পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা সেই মামলায় সওয়াল করতে খোদ তৃণমূল সুপ্রিমোকে আইনজীবীর ভূমিকায় দেখে কার্যত হকচকিয়ে যান অনেকে। এজলাসের ভেতরে তাঁর সওয়াল ছিল আক্রমণাত্মক। মমতা সপাটে জানান, **‘‘বাংলা বুলডোজার রাজ্য নয়।’’** পুলিশ কেন আক্রান্ত তৃণমূল কর্মীদের এফআইআর নিচ্ছে না, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তৃণমূলের অভিযোগ, জয়ী বিজেপির আশ্রিত দুষ্কৃতীরা রাজ্যজুড়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে। আর সেই ‘আক্রান্ত’ কর্মীদের পাশে দাঁড়াতেই আইনের ডিগ্রি আর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে এদিন ময়দানে নামেন মমতা।

কিন্তু নাটকের তখনও বাকি ছিল। শুনানি সেরে মমতা যখন এজলাস থেকে বেরিয়ে আসছেন, তখনই শুরু হয় প্রবল বিক্ষোভ। আদালত চত্বরে উপস্থিত আইনজীবীদের একাংশ তাঁকে লক্ষ্য করে সজোরে ‘চোর চোর’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি নিমেষের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। নিরাপত্তার ঘেরাটোপ ভেঙে বিক্ষোভকারীরা কার্যত মমতার গায়ের ওপর চলে আসার চেষ্টা করেন। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তিতে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় ওল্ড পোস্ট অফিস স্ট্রিট সংলগ্ন এলাকা। কোনোক্রমে পুলিশি পাহারায় গাড়িতে তোলা হয় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে।

রাজনৈতিক মহলের মতে, ২০৭টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসা শুভেন্দু অধিকারীর সরকারকে চাপে রাখতেই কি মমতার এই ‘ল ইয়ার’ অবতার? পরাজয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন মমতা হয়তো এবার অন্তরালে যাবেন। কিন্তু এদিন হাইকোর্টে তাঁর উপস্থিতি জানান দিল, লড়াই এখনই শেষ হচ্ছে না।

যদিও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এ দিনও ছিলেন মেজাজে। এই বিক্ষোভ বা মমতার কোর্টে যাওয়া প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘অনেক কাজ আছে, এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই।’’

ক্ষমতা গিয়েছে, কিন্তু লড়াইয়ের মেজাজ কি আজও সেই তিরাশির দশকেরই মতো রয়ে গিয়েছে? হাইকোর্টের এই নজিরবিহীন ঘটনা সেই প্রশ্নটাই ফের উসকে দিয়ে গেল।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *