নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনীতি: ভারতের জিডিপি ভিত্তি পরিমার্জনকে অনুধাবন

সৌরভ গর্গ: মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি দেশের অর্থনীতির আকার ও স্বাস্থ্যকে নিরূপণ করে, তা অনেকটা দেশের নম্বরপত্রের মতো। তা দেশে পণ্য ও পরিষেবা উৎপাদন কী পরিমাণে হচ্ছে, তা বোঝায়। জিডিপি’র বৃদ্ধি বলতে প্রচলিত অর্থে বোঝায়, ব্যবসার মাধ্যমে অনেক বেশি পণ্য ও পরিষেবা উৎপাদন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং আয়ের প্রসার। বিশ্ব মঞ্চেও জিডিপি’র গুরুত্ব রয়েছে। ভারত বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে তা আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে।
জিডিপি হ’ল – অর্থনীতির মূল্যায়নে একটা যন্ত্রের মতো। দেশের অর্থনীতির প্রকৃত স্পন্দন ধরতে নিয়মিতভাবে এর পরিমার্জন দরকার। জিডিপি’র ভিত্তি বছরকে নিয়মমাফিক পরিমার্জনের মধ্য দিয়েই পরিবর্তিত অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করা সম্ভব। অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানোর অর্থ নতুন শিল্পের উদ্ভব, ক্রয় ক্ষমতার পরিবর্তন এবং নতুন পরিসংখ্যান সূত্রের সূত্রপাত। এর পরিমার্জনে সরকারি পরিসংখ্যানের আরও সঠিক ও বর্ধিত মূল্যায়নের পাশাপাশি, বাস্তবতাকে ধরা যায়।
শেষ ভিত্তি বছরের পরিমার্জনের পর, নতুন পরিসংখ্যান সূত্র আমাদের জিডিপি’তে ক্ষেত্রগত ও আঞ্চলিক অবদানকে আরও পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে এবং নতুন পদ্ধতি, উদাহরণস্বরূপ – অসংগঠিত তথা অপ্রচলিত ক্ষেত্রের অবদানে যে মূল্য সংযোজিত হচ্ছে, এর মাধ্যমে তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়।
শেষ ভিত্তি বছরের পরিমার্জনের এই অন্তর্বর্তী সময়কালে কিছু নতুন পরিসংখ্যান সেট, যেমন – কোম্পানীগুলির ম্যানেজমেন্ট এবং অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সম্পর্কিত পরিসংখ্যান (এমজিটি – ৭/৭এ) থেকে তথ্য মারফৎ বিভিন্ন উদ্যোগ ক্ষেত্রের কাজকর্ম, এনআইসি ২০০৮ – এর হিসাবানুযায়ী ব্যবসা সংক্রান্ত বিবরণ এবং প্রত্যেকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানগত ব্যবসাকে ঘিরে প্রতি বছরের শতাংশ-ভিত্তিক উৎপাদন নির্ণয় করা যায়। ফলে, নতুন করে ভিত্তি বছরের পরিমার্জনে নানা কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোগ ক্ষেত্র মারফৎ সংযোজিত মূল্য নতুন এমজিটি-৭ এর ভিত্তিতে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। পূর্বে যাকে প্রধান উদ্যোগ হিসেবেই পুরোপুরি চিহ্নিত করা হ’ত। এই পরিবর্তনের ফলে ক্ষেত্রগত অবদানকে আমরা আরও সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারছি, যার মাধ্যমে অর্থনীতির পরিচালনায় প্রতিটি ব্যবসার অবদান পরিষ্কারভাবে চিত্রিত হচ্ছে।
যেমন – নতুন কোম্পানী-ভিত্তিক পরিসংখ্যান আমাদের ক্ষেত্র-ভিত্তিক অবদানকে আরও যথাযথভাবে নির্ণয় করতে সহায়তা করছে। এই নতুন পর্বে জিএসটি পরিসংখ্যানের বর্ধিত ব্যবহারে আরও সূক্ষ্ম এবং আরও সঠিকভাবে নির্ণিত জিডিপি-তে আঞ্চলিক ক্ষেত্রের অবদানকে সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে। এর মাধ্যমে বেসরকারি কর্পোরেট ক্ষেত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক বন্টনের উন্নতিসাধন এবং রাজ্য-ভিত্তিক ব্যয় খরচ পরিমাপ আরও উন্নত উপায়ে সমন্বিত করা সম্ভব হচ্ছে। যে তথ্য আগে মিলত না, অর্থাৎ
এএসইউএসই এবং পিএলএফএস – এর মতো সমীক্ষা থেকে বার্ষিক পরিসংখ্যানগত তথ্য বর্তমানে তা আমাদের অসংগঠিত ক্ষেত্রের বার্ষিক মূল্য সংযোজনের প্রকৃত মূল্যায়নে সাহায্য করছে। আগে জিডিপি’তে এদের অবদান অপ্রত্যক্ষ ও অন্যান্য সূচক হিসেবে চিহ্নিত করে দায় মেটানো হ’ত। নতুন এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ, কারণ – এই ক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ছোট ছোট পারিবারিক ব্যবসায় লক্ষ লক্ষ মানুষ, ছোট দোকান, স্বনির্ভর কর্মী, কর্মসংস্থান ও জীবিকা ক্ষেত্রে অর্থনীতিতে যারা এক বিরাট ভূমিকা পালন করে থাকেন।
ভিত্তি পুনর্মার্জন কেবলমাত্র নতুন পরিসংখ্যান সূত্রই নয়, এটি নির্নয়গত মূল্যায়ন ব্যবস্থারও উন্নতিসাধন। এক্ষেত্রে নতুন জিডিপি পর্ব মূল্যায়নগত বিকাশ সংখ্যা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
অতীতে ডবল ডিফ্লেশন পরিবর্তিত মূল্যমানে জিডিপি’কে খাপ খাওয়াতে দায় কৃষি ক্ষেত্রের উপরে আরোপ করা হ’ত। নতুন ২০২২-২৩ পর্ব থেকে ডবল ডিফ্লেশনের ব্যাপ্তি নির্মাণ ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়েছে। এর ফলে পরিসংখ্যানগত অন্য নানা ক্ষেত্রে একক বা একগুচ্ছ ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার প্রকৃত চিত্র প্রতিভাত হচ্ছে। এই অভিমুখের ফলে প্রাপ্য পরিসংখ্যানের উপযুক্ত ব্যবহারে আমাদের মূল্যায়ন অনেকটাই নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠছে। ডবল ডিফ্লেশন প্রকৃত অর্থে গভীরভাবে পরিসংখ্যান নিবিড়। এর মূল্যায়নে আউটপুট ও ইনপুট ভিত্তিক – উভয় ক্ষেত্রেই মূল্যের প্রকৃত তথ্য প্রয়োজন হয়। যত বেশি সংখ্যক এই পরিসংখ্যান হাতে আসছে, অন্যান্য আরও ক্ষেত্রগুলিতেও এর ব্যবহার ততধিক প্রসারিত হচ্ছে।
মূল্যায়নগত উৎকর্ষের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনে অর্থনীতির ক্ষেত্রে একদিকে যেমন (উৎপাদন ক্ষেত্রে) উৎপাদিত সামগ্রিকে বোঝায়, অন্যদিকে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীগোষ্ঠী এবং ব্যবসাকে (খরচের ক্ষেত্রকেও) বোঝায়। এই দুইয়ের প্রায়শই সঠিক মেলবন্ধন হয় না এবং বিশ্বজুড়ে তা সাধারণ ঘটনা হিসেবে প্রতিফলিত। বিশেষ করে, ত্রৈমাসিক জিডিপি’তে। এই বিষয়টির উপর আলোকপাত করতে নতুন পর্বে ‘সাপ্লাই অ্যান্ড ইউজ টেবিলস’ পরিকাঠামোর ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে বৈষম্যের দিক প্রাথমিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে এবং চূড়ান্ত পর্বে যখন পূর্ণ পরিসংখ্যান তালিকা তৈরি হ’ল – তখন তার বিলোপ ঘটানো সম্ভব হয়।
পরিমার্জিত জিডিপি অর্থনীতিকে অনেকটা নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার মতো। প্রতিটি অর্থনৈতিক কার্যকলাপ ছোট বা বড় দেশের বিকাশে তাদের অবদান যথার্থ প্রকাশিত হলে তা আমাদের প্রকৃত নজরে আসে। উন্নত পরিসংখ্যানের ব্যবহারে পরিমার্জিত ব্যবস্থায় এবং আন্তর্জাতিক শ্রেষ্ঠ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গতিবিধান করে মন্ত্রক অর্থনীতির আরও যথার্থ মূল্যায়ন গড়ে তুলেছে। নাগরিকদের জন্য এর অর্থ হল নীতি ও জনপরিষেবাগত ক্ষেত্রে অর্থনীতি কিভাবে কাজ করছে, তা আরও সঠিকভাবে বুঝতে সাহায্য করা,যাতে কেবলমাত্র খাতায়-কলমে নয়, প্রাত্যহিক জীবনে আমরা সেই বিকাশের স্পন্দন অনুভব করতে পারি।
লেখক কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রকের সচিব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *