নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: বৈশাখের তপ্ত দুপুরে ভবানীপুরের রাজপথ দেখল নজিরবিহীন রণক্ষেত্র। উপলক্ষ ছিল বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়ন পেশ। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার যা ঘটল, তাকে গত কয়েক দশকের নির্বাচনী ইতিহাসে বিরল বলছেন রাজনীতির কারবারিরা। খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতেই তৃণমূল-বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রের চেহারা নিল কালীঘাট এলাকা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, নিরাপত্তার খাতিরে মাঝপথেই রোড শো-এর হুডখোলা গাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন শাহ।
মুখ্যমন্ত্রীর দুয়ারে সংঘাত
এদিন হাজরা মোড় থেকে বিশাল রোড শো শুরু করেন অমিত শাহ ও শুভেন্দু অধিকারী। মিছিল যখন হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট সংলগ্ন অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির খুব কাছ দিয়ে যাচ্ছিল, তখনই উত্তেজনার সূত্রপাত। অভিযোগ, রাস্তার ধার থেকে তৃণমূল কর্মীরা মিছিল লক্ষ্য করে কালো পতাকা দেখান এবং ‘গো ব্যাক’ স্লোগান তোলেন। পালটা হুঙ্কার দেন বিজেপি কর্মীরাও। মুহূর্তের মধ্যে দু’পক্ষের বচসা হাতাহাতিতে রূপ নেয়। পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায়। পুলিশের সঙ্গেও রাজনৈতিক কর্মীদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। উত্তেজনা চরমে পৌঁছালে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে শাহের কনভয় থমকে যায়। এরপর বড় প্রচারগাড়ি থেকে নেমে একটি ছোট গাড়িতে উঠে এলাকা ছাড়েন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখান থেকেই সোজা চলে যান মনোনয়ন কেন্দ্রে।
‘মমতার ঘরে গিয়ে হারান’, চ্যালেঞ্জ শাহের
মনোনয়ন পেশের আগে এক জনসভা থেকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন অমিত শাহ। শুভেন্দুকে ভবানীপুরে দাঁড় করানোর নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “শুভেন্দুদা নন্দীগ্রাম থেকে লড়তে চেয়েছিলেন। আমিই বলেছিলাম, শুধু নন্দীগ্রাম নয়, মমতার ঘরে গিয়ে ওকে হারান।”বিগত নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে শাহ বলেন, “গতবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার গড়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ব্যক্তিগতভাবে হেরেছিলেন। এবার ভবানীপুরবাসী যদি একটি আসনে শুভেন্দুকে জিতিয়ে দেন, তবে গোটা বাংলায় আপনা-আপনি পরিবর্তন আসবে। এটিই আমার কাছে শর্টকাট।” “আমি বাংলার মানুষের চোখে ভয় দেখেছি— তোলাবাজি, গুন্ডাগরি আর দুর্নীতির ভয়। এবার মমতাজিকে ‘বাই বাই টাটা’ করার সময় এসেছে,” হুঙ্কার শাহের।
১৫ দিন বাংলায় থাকার ঘোষণা
এদিন শাহ সাফ জানিয়ে দেন, আগামী ১৫ দিন তিনি বাংলাতেই থাকছেন এবং গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন। তাঁর দাবি, ভবানীপুরের ভোটারদের হাতেই নির্ভর করছে গোটা রাজ্যের ভাগ্য।
অন্যদিকে, শুভেন্দুর মনোনয়ন পেশের দিনে এই গোলমাল নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর। তৃণমূলের দাবি, বিজেপি বাইরে থেকে লোক এনে এলাকায় অশান্তি ছড়াচ্ছে। পালটা বিজেপির অভিযোগ, পরাজয় নিশ্চিত বুঝেই মুখ্যমন্ত্রী নিজের খাসতালুকে পুলিশ দিয়ে ‘সন্ত্রাস’ কায়েম করছেন। সব মিলিয়ে, ভবানীপুরের ভোট যে এবার কার্যত স্নায়ুযুদ্ধে পরিণত হয়েছে, তা আজ কালীঘাটের ধুলো ওড়া রাজপথই প্রমাণ করে দিল।