নিজস্ব প্রতিনিধি: দূষণে জর্জরিত শিল্পনগরী দুর্গাপুরে এমন এক কোণ আছে, যেখানে ঢুকলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। ধোঁয়া-ধুলোয় ঢাকা শহরের মাঝখানে মুচিপাড়ার একটি বেসরকারি কারখানার আবাসন এলাকা যেন হঠাৎই রঙিন হয়ে ওঠে ফুলে আর সবুজে। বছরের এই কয়েকটা দিন সেই আবাসন পরিণত হয় এক ছোট্ট বাগানমেলায়, যেখানে প্রতিটি টব, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ফুলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে যত্ন আর ভালোবাসার গল্প।
এ কোনও সাম্প্রতিক উদ্যোগ নয়। টানা ৪৬ বছর ধরে আবাসনের গৃহবধূরাই নিজেদের হাতে গড়ে তুলেছেন এই পুষ্প প্রদর্শনীর ঐতিহ্য। ঘরের কাজ সামলে, পরিবারের দায়িত্বের ফাঁকে সময় বের করে তাঁরা বছরের পর বছর ধরে গাছের পরিচর্যা করেছেন। সেই যত্নেরই প্রকাশ ঘটে বার্ষিক এই প্রদর্শনীতে। গোলাপ, ডালিয়া, গাঁদা থেকে শুরু করে নানা শোভা বর্ধনকারী গাছ—সব মিলিয়ে যেন রঙের এক উৎসব।
তবে শুধু ফুলেই সীমাবদ্ধ নয় এই আয়োজন। এবারের প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা সবজি। রাসায়নিক সার ছাড়াই টবে জন্মেছে টমেটো, লঙ্কা, পালং, বেগুনসহ নানা সবজি। ছোট্ট জায়গায়, সীমিত উপকরণে কীভাবে পরিবেশবান্ধব চাষ করা যায়, সেই বার্তাও ছড়িয়ে পড়েছে এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে। দর্শকদের অনেকেই থেমে থেমে গাছ দেখেছেন, চাষের পদ্ধতি নিয়ে কথা বলেছেন, পরামর্শ নিয়েছেন।
সোমবার সকাল থেকেই আবাসনের ভেতর ছিল উৎসবের আবহ। এ বছর ৪৬ জন মহিলা প্রতিযোগী অংশ নেন। সংখ্যাটা যেন প্রতীকীও—৪৬ বছরের ঐতিহ্যে ৪৬ প্রতিযোগী। তবে এখানে প্রতিযোগিতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে অংশগ্রহণ। তাই সবার হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার। কোনও প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয়ের চাপ নেই। আছে শুধু একসঙ্গে কিছু গড়ে তোলার আনন্দ।
এই পুষ্প প্রদর্শনী শুধু ফুল দেখার অনুষ্ঠান নয়। শিল্পাঞ্চলের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে এটি এক টুকরো স্বস্তি, একটুখানি নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা। সবুজের প্রতি ভালোবাসা, জৈব চাষের বার্তা আর প্রতিবেশী সম্পর্কের উষ্ণতা—সব মিলিয়ে এই উদ্যোগ হয়ে উঠেছে আবাসনের গর্ব। বছর ঘুরে আবার যখন প্রদর্শনীর দিন আসে, তখন নতুন করে মনে পড়ে যায়, কংক্রিটের শহরেও সবুজ বাঁচিয়ে রাখা যায়, যদি থাকে ইচ্ছে আর যত্ন।